আর্থিক খাতে নৈরাজ্য ও লুটপাট জেঁকে বসেছিল দুরারোগ্য ব্যাধির মতো। জনজীবনে নাভিশ্বাস তুলে দিয়েছিল মূল্যস্ফীতি। ধস নামছিল রিজার্ভে। সব মিলিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের শেষ বছরগুলো পার হয়েছিল যেকোনো সময় অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধসের আশঙ্কার মধ্য দিয়ে। বিপর্যয় ঠেকাতে সরকার দ্বারস্থ হয় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ)। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংস্থাটির পক্ষ থেকে বেশকিছু শর্ত বেঁধে দেয়া হয়। চাপ প্রয়োগ করা হয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ানোসহ বেশকিছু খাতে ভর্তুকি কমিয়ে আনার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে জোর দেয়া হয় সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণের। বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করে দেয়া, নিট রিজার্ভ বাড়ানো, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত সংস্কার এবং ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ হ্রাসেও জোরারোপ করা হয়। এসব শর্ত পূরণ করতে গিয়ে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি তো হয়ইনি, উল্টো আরো জোরালো হয়ে জেঁকে বসে মূল্যস্ফীতি। পরিস্থিতির উন্নয়ন না হলেও আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থনৈতিক কর্মসূচির বড় অংশ জুড়ে ছিল আইএমএফের শর্ত পূরণ।
জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন দেশের আর্থসামাজিক খাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি করে। তীব্রতর হয়ে ওঠে অর্থনীতি জনকল্যাণমুখী হয়ে ওঠার প্রত্যাশা। অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলের প্রায় পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। যদিও এখনো আইএমএফের দর্শনেই চলেছে দেশের অর্থনীতি। দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের নীতিগত কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না এখনো।
উল্টো এখন আরো তীব্র হয়ে দেখা দিয়েছে মূল্যস্ফীতি। বিগত সময়ের সুবিধাভোগীরাও এখন আস্তে আস্তে আবারো সক্রিয় হয়ে ওঠার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আবাসন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রয়ে গেছে এখনো। এখনো কার্যকর আওয়ামী লীগ সরকারের প্রণীত বাজেট। জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের মূল আলোচনাটি তৈরি হয়েছিল বৈষম্য দূর করাকে কেন্দ্র করে। যদিও বৈষম্য দূর করে অর্থনীতিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করা যায়নি এখনো।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশনে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানো বা এতে কাঠামোগত পরিবর্তন আনার প্রয়াস কখনো অতীতে সফল হতে দেখা যায়নি। বরং সরকার আইএমএফের কাছ থেকে আরো বাড়তি তহবিল চাওয়ায় সামনে নতুন করে আরো কিছু শর্ত বাস্তবায়নের চাপ তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদিও বাংলাদেশ এখনো অর্থনীতির মূল দর্শনকে এ প্রেসক্রিপশনের বাইরে আনতে পারেনি। ফলে দেশের অর্থনীতি এখনো অন্তর্ভুক্তিমূলক বা জনকল্যাণমূলক হতে পারেনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এবং ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা যদি অতীতের দিকে তাকাই তাহলে দেখব যে আশির দশকে অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিলাম। শুধু আমরা নই অন্য অনেক দেশও নিয়েছিল। এ ধরনের ঋণ কিন্তু ভালো কিছু বয়ে নিয়ে আসেনি। কারণ এটি আমাদের নিজস্ব চিন্তাভাবনা ছিল না, বরং আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের চিন্তা ছিল। অভিজ্ঞতা বলে এ ধরনের সহায়তা প্রকল্প এগুলো সমস্যা সমাধানে বিশেষ করে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানো বা কাঠামোগত পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে হোক অতীতে কখনো সফল হয়নি। এবারো যে আগস্টের চেতনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কোনো পরিবর্তন আসবে, সেটি আমার কাছে মনে হয় না। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া প্রয়োজন। কাজেই আমাদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে কী ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনা প্রয়োজন, সেটি আমাদেরই ঠিক করা উচিত। প্রয়োজনে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক বা অন্য কেউ যদি সহায়তা করতে চায়, সেটি নেয়া যেতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের অর্থনীতির মূল সমস্যা হলো বর্তমানে এটি স্থবির হয়ে আছে। গত ১৫-২০ বছরে অর্থনীতির কাঠামোগত যে বিবর্তন হয়েছে, সেটির কারণে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অসমতা বেড়েছে, যেটিকে আমরা বৈষম্য বলি। এ বৈষম্য কমিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন আনার ক্ষেত্রে আইএমএফ বিশ্বব্যাংকের নীতিগুলো ভূমিকা রাখবে বলে মনে হয় না। অথচ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মূল কথা ছিল সংস্কার করা এবং বৈষম্য দূর করে এমন একটি সমাজ গঠন করা, যেখানে সবার কল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। আমরা সে পথে না হেঁটে অন্য পথে হাঁটছি। এ পথ আমাদের বৈষম্যবিরোধী চেতনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।’
দেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের উত্থান ঘটে নব্বইয়ের দশকে। এর ধারাবাহিকতায় স্থানীয় উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি রফতানিতেও সাফল্য আসে। বিকশিত হতে থাকে অর্থনীতি। এর দুই দশক পর বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দেশের অর্থনীতিতে আবির্ভাব হয় অলিগার্ক বা গোষ্ঠীতন্ত্রের। উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির বয়ানের অন্তরালে অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য নিজস্ব ঘরানার ব্যক্তিদের কাছে কেন্দ্রীভূত হতে থাকে। রাষ্ট্রীয় নীতিও তৈরি হয় এ শ্রেণীর স্বার্থকে কেন্দ্র করে। এমনকি নিজেদের প্রয়োজনমতো রাষ্ট্রীয় নীতির পরিবর্তন ঘটানোর ক্ষমতাও তাদের হাতে পুঞ্জীভূত হতে থাকে।
রাষ্ট্রের নাগরিকদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, সুরক্ষা, মৌলিক সেবার নিশ্চয়তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সর্বোপরি বৈষম্য প্রশমনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রণীত বাজেটগুলো পরিচিত জনকল্যাণমুখী বাজেট হিসেবে। বাংলাদেশের মানুষ বহু বছর ধরে জনকল্যাণমুখী বাজেট থেকে বঞ্চিত। বরং বাজেট বাস্তবায়ন করতে গিয়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নামে যথেচ্ছ তছরুপ হয়েছে জনগণের অর্থের। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটটিও এর ব্যতিক্রম নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের ফলে গণবিরোধী এ বাজেট কাঠামো পরিবর্তনের সুযোগ ছিল। যদিও এখন পর্যন্ত আগের সরকারের প্রণীত বাজেটই বলবৎ রয়ে গেছে। সম্প্রতি বাজেট সংশোধনের যে সিদ্ধান্ত হয়েছে তাতে এর আকার কমবে সামান্যই। বরং সামনের অর্থবছরের বাজেটের আকার আরো বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। একইভাবে বহাল রয়েছে বিগত সরকারের গৃহীত রাজস্ব ও মুদ্রানীতিও।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারকে কিছু ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সমাধান করতে হবে এবং কিছু ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হলে সেটি আইএমএফের পরামর্শ অনুসারে করলে হবে না, সেটি করতে হবে স্থানীয় বাস্তবতা অনুসারে। বর্তমানে আমরা উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে আছি। মূল্যস্ফীতি হচ্ছে সরবরাহজনিত কারণে, চাহিদাজনিত কারণে নয়। এক্ষেত্রে শুধু সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমবে না। সরকারের জন্য অলিগার্কদের ম্যানেজ করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। একটা শ্রেণী আছে যারা ট্রেডার। তারা এখান থেকে শোষণ করে অর্থ বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। আরেকটা শ্রেণী হচ্ছে যারা এখানে বিনিয়োগ করেছে এবং শিল্পায়নের জন্য তাকে প্রয়োজন, কিন্তু সে নিজে বড় হয়ে যাচ্ছে। এই যে অলিগার্ক ব্যবস্থাপনা, এটি তো আর আইএমএফের প্লেবুকে নেই। সরকারের পক্ষ থেকে সংশোধন করে একটি বাজেট তৈরি করা প্রয়োজন ছিল, সেটিও তো হয়নি।’
দ্রব্যমূ্ল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে প্রায় তিন বছর ধরে মূল্যস্ফীতির চাপে দিশাহারা দেশের সাধারণ মানুষ। মূল্যস্ফীতি কমাতে সুদহার বাড়ানোর নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল গত বছরের জুনে। শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলেও একই নীতি অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলে নীতি সুদহার উন্নীত করা হয়েছে ১০ শতাংশে। যদিও মূল্যস্ফীতি না কমে উল্টো নভেম্বরে এসে ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ ছুঁয়েছে। আর খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি উঠেছে ১৩ দশমিক ৮০ শতাংশে। অতিসংকোচনমূলক মুদ্রানীতির প্রভাবে বেসরকারি খাত বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প তীব্র তারল্য সংকটে পড়েছে। শ্রমিক অসন্তোষ ও বিশৃঙ্খলা চলছে দেশের তৈরি পোশাক খাতসহ সব শিল্পে।
ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের ঘোষিত বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও খাদ্যশস্য সরবরাহের ওপর উৎসে কর ২ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয়া হয়। এ ঘোষণার উদ্দেশ্য ছিল নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার স্থিতিশীল করা। যদিও কর ও শুল্কছাড়ের ঘোষণায় পণ্যের দাম কমেনি। পণ্যের দাম আরো বেড়ে যাওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারও সাম্প্রতিক সময়ে কয়েক দফায় চাল, ভোজ্যতেল, চিনি, পেঁয়াজ, আলু ও ডিমের ওপর শুল্ক ছাড় বা প্রত্যাহার করেছে। কিন্তু বাজার ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে শুল্ক প্রত্যাহারের সুফল পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ। বিপরীতে যেনতেনভাবে বাজার অস্থিতিশীল বিপুল পরিমাণে মুনাফা লুটে নিচ্ছে বাজার সিন্ডিকেটগুলো।
শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ১৮৮ শতাংশ। ওয়াসার পানির দাম বেড়েছে ২০০ শতাংশের কাছাকাছি। অস্বাভাবিক হারে বাড়ানো হয়েছে গ্যাস ও জ্বালানি তেলের দামও। জনগণের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলা এসব গণদ্রব্যের দাম কমানোর সুযোগ ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে। যদিও বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি তেল ও পানির মতো গণদ্রব্যের মূল্য নির্ধারণ চলছে আগের পদ্ধতিতেই। গত দেড় দশকে দেশে পরিবহন ব্যয় বহু গুণ বেড়েছে। এক্ষেত্রে অভিযোগ ছিল বিপুল অংকের চাঁদাবাজির। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের চাঁদাবাজরা পালিয়ে গেলেও পরিবহন ভাড়া কমেনি। বরং নতুন চাঁদাবাজরা সে স্থান দখল করেছে এবং এক্ষেত্রে কার্যত কোনো ব্যবস্থাই নিতে পারেনি সরকার।
আইএমএফের প্রেসক্রিপশন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উদ্ভাবনীমূলক পদক্ষেপ নিতে পারত বলে মনে করছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আইএমএফের সঙ্গে করা ঋণ চুক্তির আওতায় সংস্কারের যেসব শর্ত ছিল, তার একটি বড় অংশজুড়ে ছিল সরকারি তহবিল ব্যবস্থাপনা পুনরুদ্ধার করা। এর উদ্দেশ্য ছিল সাশ্রয়ী হওয়া, কৃচ্ছ্রসাধন, ভর্তুকি কমানো, অপচয় হ্রাসের মতো বিষয়গুলো নিশ্চিত করা। এগুলো আইএমএফ না থাকলেও করতে হতো। তবে আইএমএফ যে প্রক্রিয়ায় ভর্তুকি কমানোর কথা বলেছে, সেক্ষেত্রে আমাদের উচিত ছিল উদ্ভাবনী পথে এটি বাস্তবায়ন করা। এক্ষেত্রে আমরা আগের ও বর্তমান—উভয় সরকারেরই উদ্যোগের ঘাটতি দেখছি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে যে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি, সেটি সমন্বয়ের জন্য মূল্যবৃদ্ধি করা উচিত হবে না এবং এতে ভোক্তার ওপর চাপ বাড়বে। বরং জ্বালানির ক্ষেত্রে উল্টো দাম কমানোর সুযোগ রয়েছে। এ জায়গায় আমাদের উদ্যোগের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। সেদিকে নজর দেয়া দরকার। যেহেতু এ সরকারকে একটি ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিতে হয়েছে, সেহেতু পুনরুদ্ধারকেই প্রাধান্য দিতে হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে যে সব সময় সঠিক উদ্যোগ নিতে দেখছি, তা নয়। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় এ সরকারের যে নিজস্ব কিছু চিন্তাভাবনা রয়েছে, সেটির প্রতিফলন গুরুত্বপূর্ণ। যেটি দুয়েকটি ক্ষেত্রে চোখে পড়ছে, কিন্তু সব খাতে দৃশ্যমান নয়। মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে শুধু সুদের হার বাড়িয়ে দিয়ে নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন। বরং বাজার ব্যবস্থাপনায় হাত দেয়া দরকার। যে জায়গাটায় সরকারের বাণিজ্য, কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগগুলো হয় অপর্যাপ্ত অথবা গতানুগতিক অথবা কোনো ক্ষেত্রে তারা বিষয়গুলোর জটিলতা অনুধাবন করতে পারছেন না। এ মন্ত্রণালয়গুলো যদি সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনায় উন্নতি করতে না পারে, তাহলে শুধু সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনাটা কষ্টকর।’
১৫ শতাংশ কর দিয়ে চলতি অর্থবছরের জন্য ঘোষিত বাজেটে কালো টাকা সাদা করার বিধান রেখেছিল শেখ হাসিনার সরকার। তবে গত ২ সেপ্টেম্বর এনবিআর থেকে জারীকৃত এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সিকিউরিটিজ, নগদ, ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ, আর্থিক স্কিম ও ইনস্ট্রুমেন্ট, সব ধরনের ডিপোজিট বা সেভিং ডিপোজিটের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিলের ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু বাজেটের সময় ঘোষিত আবাসন খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত পরিমাণে কর পরিশোধের মাধ্যমে অপ্রদর্শিত পরিসম্পদ (কালো টাকা) প্রদর্শিত (সাদা) করা সংক্রান্ত বিধানটি বহাল রাখা হয়েছে। এতে এলাকাভেদে স্থাপনা, বাড়ি, ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট, ফ্লোর স্পেস ও ভূমিতে প্রতি বর্গমিটারের বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণে কর পরিশোধ করে অপ্রদর্শিত অর্থ প্রদর্শিত করার সুযোগ রয়ে গেছে এখনো।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার জনবিমুখ এ বাজেটের সংস্কার ও পরিবর্তন করবে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন সাপেক্ষে অর্থবছরের বাকি মেয়াদের জন্য একটি জনমুখী বাজেট ঘোষণারও সুযোগ ছিল। প্রত্যাশা ছিল, অন্তর্বর্তী সরকার জনমুখী পদক্ষেপ নেবে, আর নতুন পদক্ষেপে মূল্যস্ফীতি কমবে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সরকারের ব্যয় বাড়বে। জনগণের ওপর পরোক্ষ করের বোঝা কমবে। বিদ্যুৎ-পানিসহ যাতায়াত ব্যবস্থা আরো সাশ্রয়ী হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এর কোনোটিই দেখা যায়নি। উল্টো বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশে উন্নীত করায় দেশের বেসরকারি খাত ঋণের খরায় ভুগছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যয় আরো বেড়েছে। সেপ্টেম্বরে এসে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির হার নেমেছে ৯ দশমিক ২০ শতাংশে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আমাদের পুরো সহানুভূতি রয়েছে এবং আমরা চাই তারা সফল হোন। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে অভিজ্ঞতার ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে অনেক ক্ষেত্রে জনসম্পৃক্ততার ঘাটতি প্রকট। অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়ে ঘাটতি রয়েছে। মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষ প্রচণ্ড কষ্টে আছে। কিন্তু তা নিয়ন্ত্রণে সরকারের পক্ষ থেকে যথেষ্ট উদ্যোগ দেখা যায়নি। মূলত সাপ্লাই চেইনের সমস্যার কারণে বাজারে ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে। এটি নিয়ন্ত্রণে টিসিবির মতো প্রতিষ্ঠানকে আরো শক্তিশালী করার প্রয়োজন ছিল। টিসিবির মাধ্যমে ঢাকা শহরে ট্রাকে পণ্য বিক্রি যথেষ্ট নয়, সারা দেশে ডিস্ট্রিবিউটর নিয়োগের মাধ্যমে সবার কাছেই সুলভমূল্যে পণ্য পৌঁছানোর উদ্যোগ নেয়া যেত। সরকারের উদ্যোগে উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে বড় মাত্রায় পণ্য এনে বাজারে সরবরাহের ব্যবস্থা করা যেত। তাতে করে সিন্ডিকেটের প্রভাব ভেঙে দেয়া সম্ভব হতো। কিন্তু এ ধরনের উদ্যোগ আমরা দেখছি না। সামনে বাজেট আসছে, কিন্তু এ নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এখনো আলোচনা করার কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। এমনকি আমরা সময় চেয়েও সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাচ্ছি না। কিছু ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোয় সঠিক ব্যক্তি নিয়োগ করা হয়নি। এক্ষেত্রে সময় নিয়ে হলেও সঠিক ব্যক্তি নিয়োগ করাটা জরুরি ছিল। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক নয়। এ কারণে শিল্পাঞ্চলগুলোয় উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সরকারের দিক থেকে করণীয় সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ থাকা প্রয়োজন ছিল।’
গত দেড় দশকে নজিরবিহীন অরাজকতা ও লুটপাটের মধ্য দিয়ে গেছে দেশের ব্যাংক খাত। নামে-বেনামে নিজ ব্যাংক থেকেই আমানতকারীদের অর্থ লোপাট করেছেন চেয়ারম্যান-পরিচালকরা। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর দেশের বেসরকারি খাতের ১১টি ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দিয়েছে। এর ফলে লুটপাট সাময়িক বন্ধ হলেও ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের আস্থা হারিয়েছে। তীব্র হয়েছে পর্ষদ ভেঙে দেয়া ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট। চাহিদা অনুযায়ী আমানত তুলতে না পেরে লাখ লাখ গ্রাহক দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। সম্প্রতি ছয়টি ব্যাংকে তারল্য সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু তাতেও সংকট কাটেনি। পাশাপাশি বেশকিছু ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানও গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আইএমএফের পরামর্শে মূলত সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনার কিছু নির্দিষ্ট জায়গা যেমন মুদ্রানীতি ও বিনিময় হারের ক্ষেত্রে কিছু সংস্কার হয়েছে। আর্থিক খাতের কিছু নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর সংস্কার হয়েছে। আরো কিছু সংস্কারের কথা বলা হয়েছে যেগুলোর জন্য আইনি কাঠামোয় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। এর প্রক্রিয়াগত কারণে কিছুটা সময় লাগছে। নানা রকম সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আমরা নতুন কিছু করতে পারিনি। প্রচলিত পথেই হেঁটেছি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আইএমএফের পরামর্শে কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করা হলেও এর ফলাফল এখনো দেখতে পাইনি। এক্ষেত্রে বাজার ব্যবস্থাপনার বিষয়ে অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি যথাযথ নজরদারি কাঠামো ও প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা যেত, যেটি আমরা দেখিনি। মানুষ নিরাপত্তার ইস্যুতে, মূল্যস্ফীতির বিষয়ে ত্বরিত স্বস্তি চায়। এগুলোর ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা আরো ভালো হতে পারত।’